![]() |
| Voyager 1 and Voyager 2 |
ভয়েজার ১ কিভাবে চলার শক্তি পায়! এটা বুঝতে হলে আগে অরবিটাল মেকানিক্স এবং গ্র্যাভিটি এসিস্ট সম্পর্কে কিছু ধারণা নিতে হবে।
যদি প্রশ্ন করা হয়, পৃথিবীর চারপাশে চাঁদ কিভাবে ঘুরছে? বা সূর্যের চারপাশে পৃথিবী কি করে ঘুরছে? এদের কি জ্বালানি প্রয়োজন হয়? উত্তর গুলো আমাদের সবারই জানা। এক কথায় বললে মধ্যাকর্ষন বলের প্রভাবে!! কিন্তু প্রসেস টা কি?
অরবিটাল মেকানিক্স সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় স্যার আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ বলের তথ্য দেওয়ার পর।
তিনি চাঁদের ঘুর্নন ব্যাখ্যা করার জন্য একটা Thought Experiment করেছিলেন। এক্সপেরিমেন্টটা অনেকটা এরকম ছিলো-
ধরুন আপনি একটি বল পৃথিবীর পৃষ্ঠ বরাবর সামনের দিকে ছুড়ে মারলেন। কি ঘটবে? বলটা কিছুদূর গিয়ে মাটিতে পরে যাবে। যদি আরেকটু জোরে ছুড়ে মারেন তাহলে আরেকটু সামনে গিয়ে পরবে। এভাবে যতই জোরে ছুড়ে দিবেন ততই দূরে গিয়ে পরবে।
মানুষের মাসল পাওয়ার লিমিটেড। তাই এবার একটা শক্তিশালী মেশিনগান নিয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে সেখান থেকে যেকোনো একদিকে ফায়ার করুন! মোটামুটি স্পিডে ফায়ার করলেও দেখা যাবে এটি অনেকটা পথ অতিক্রম করে মাটিতে পরে যাবে। আরও বেশি শক্তি দিয়ে ফায়ার করলে দেখা যাবে গুলিটি পৃথিবীর অর্ধেক দূরত্ব অতিক্রম করার পর মাটিতে পরে যাবে! এবার ফুল পাওয়ার দিয়ে ফায়ার করলে পরে দেখা যাবে গুলিটি আর মাটিতে পরছে না! বরং সম্পূর্ণ পৃথিবীকে পারি দিয়ে আবার মেশিনগানের পিছনে আঘাত করবে। যদি ফায়ার করার পর মেশিনগানটি সরিয়ে নেওয়া হয় তাহলে দেখা যাবে গুলিটি পৃথিবীকে বৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করেই চলছে। আর মাটিতে পরছে না। মধ্যাকর্ষন বলের প্রভাবে সে ঠিকই বাকা পথ ধরে পরে যেতে চাইছে কিন্তু প্রতিক্ষেত্রেই সে পৃথিবীকে মিস করে যাবে। তখন বলা হবে গুলিটি একটি অরবিটালে চলে গেছে। আর এখানে তার উপর মধ্যাকর্ষন বল আর বৃত্তাকার পথে ঘুর্ণনের ফলে উৎপন্ন কেন্দ্রবিমুখী বল সমান হয়ে যায়। এভাবেই চাঁদ প্রতিনিয়ত পৃথিবীর চারপাশে পরে যাচ্ছে কিন্তু পৃথিবীকে মিস করে যাচ্ছে। কারণ চাঁদের ক্ষেত্রেও সে বৃত্তাকার পথে গতিশীল থাকায় উৎপন্ন কেন্দ্রবিমুখী বল আর
চাঁদের উপর পৃথিবীর মধ্যাকর্ষন বল সমান হয়ে যায়। ফলে বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার পথে পরিভ্রমণ করতে পারে। এতে করে তার আর কোনো বাহ্যিক শক্তির প্রয়োজন হয় না।
এই ফরমুলাকে কাজে লাগিয়েই আমরা পৃথিবীর কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাতে পারি, যেগুলো ঠিক আমাদের প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদের মতো করেই বাহ্যিক শক্তি ছাড়াই অবিরাম ঘুরতে পারে। শুধুমাত্র রকেট দিয়ে কৃত্রিম উপগ্রহটিকে তার কক্ষপথের বেগটা অর্জন করিয়ে দিতে পারলেই হয়।
এভাবে একই গতিতে চলতে থাকলে মহাকাশযানটি বৃত্তাকার পথে পৃথিবীকে পরিভ্রমণ করবে। যদি এই পথের কোনো একটা জায়গায় মহাকাশযানটির গতি থ্রাস্টার দিয়ে কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে মহাকাশযানটি উপবৃত্তাকার পথে পৃথিবীকে পরিভ্রমণ করতে থাকবে। এরকম ভাবে চললে মহাকাশযানটি পৃথিবীকে তার উপবৃত্তাকার কক্ষপথের একটি ফোকাসে রেখে ঘুরতে থাকবে। ফলে সে একবার পৃথিবী থেকে দূরে চলে যাবে এবং বেগ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকবে। আরেকবার অন্যপাশ দিয়ে পৃথিবীর কাছে চলে আসবে আর বেগ বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
এভাবে মহাকাশযানটি যখন পৃথিবীর কাছে চলে আসে তখন তার বেগ সামান্য পরিমান বাড়ালেও কক্ষপথের ব্যাস অনেকটা বেড়ে যায় ফলে মহাকাশযানটি একদিকে পৃথিবী থেকে অনেকটা দূরে আরেকদিকে কাছে থেকে পরিভ্রমণ করে।
এভাবে বেগ বাড়াতে বাড়াতে যখন পৃথিবীর মুক্তি বেগের সমান বেগ দেওয়া হয়, তখন মহাকাশযানটি আর পৃথিবীর দিকে ফিরে আসে না। তার উপবৃত্তাকার কক্ষপথের ব্যাস এতোটাই বেশি হয়, বা তার কেন্দ্রবিমুখী বল এতোটাই বেশি হয় যেটাকে পৃথিবী আর নিজের দিকে নিয়ে আসতে পারে না। এভাবেই ভয়েজার ১ কে ক্রমান্বয়ে থ্রাস্ট করে বৃহস্পতি গ্রহের দিকে পাঠানো হয়েছিলো।
তারপর বিজ্ঞানীরা চিন্তা করলো, যেহেতু বৃহস্পতির মধ্যাকর্ষন বল পৃথিবীর তুলনায় অনেক বেশি সেহেতু যখম ভয়েজার ১ বৃহস্পতির গ্র্যাভিটি দ্বারা আকর্ষিত হবে তখন প্রবল বেগে বৃহস্পতির পাশ দিয়ে ছুটতে থাকবে।
কোনো প্রকার শক্তি ছাড়াই শুধুমাত্র বৃহস্পতির গ্র্যাভিটি কে কাজে লাগিয়ে ভয়েজার ১ এর বেগ অনেক বেশি বেড়ে যাবে। তখন যদি বৃহস্পতির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভয়েজারের থ্রাস্টার অন করে সামান্য পরিমান ত্রাস্ট করা হয় তাহলে তার বেগ আরও বেড়ে যাবে!! এভাবে সামান্য পরিমান জ্বালানি ব্যবহার করেই ভয়েজারের বেগ অনেক বেশি বাড়িয়ে শনি গ্রহের দিকে চালানো হয়!
কোনো গ্রহের গ্র্যাভিটিকে কাজে লাগিয়ে এভাবে বেগ বৃদ্ধি করে নেওয়ার প্রক্রিয়াটাকেই বলা হয় গ্র্যাভিটি এসিস্ট!
ঠিক একই ভাবে শনি গ্রহের গ্র্যাভিটিকে কাজে লাগিয়ে সামান্য জ্বালানি ব্যবহার করে তার বেগ আরও বাড়িয়ে নেওয়া হয়। এখন সে এই বেগ নিয়েই আমাদের সৌরজগতের বাইরের দিকে অবিরাম চলতে থাকবে! তার গতি কোনোদিন কমবে না বরং দিন দিন আরও বেড়েই চলবে। এভাবে চলতে চলতে সৌরজগতের কুইপার বেল্ট পার হয়ে অলরেডি ইন্টারস্টেলাএ স্পেসের দিকে ভয়েজার ক চলছে। সেখান থেকে সিগনাল পেতে প্রায় ১৬/১৭ ঘন্টার মতো সময় লাগে।
এভাবে যত দিন যাবে, পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব বাড়তেই থাকবে। আর সিগনাল আসার সময়ও বাড়তে থাকবে। একসময় হয়তো অত্যাধিক দূরত্বের জন্য ভয়েজারের সাথে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, তবুও সে চলতেই থাকবে!এভাবে সে হয়তো একদিন আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিকেই পারি দিয়ে দিবে কিন্তু আমরা তা বুঝতেও পারবো না, কারণ তার আগেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আবার হয়তো অন্য কোনো নক্ষত্রের গ্র্যাভিটি দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে তার মাঝে ভ্যানিস হয়ে যাবে। তাই কেউই বলতে পারবে না এই ভয়েজারের শেষ পরিনতি কি হবে!

No comments:
Post a Comment