মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য! The Mystery of Creation of the Universe

মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য

মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য!

মহাবিশ্ব! বিশ্বভ্রম্মান্ড! বা ইউনিভার্স! যেই নামেই ডাকা হোক না কেন সব নামগুলোর মাঝেই একটা অসীম বিসতৃতির আছ পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, এই বিসতৃতির সাথে সাথে মানব মনে এক অপরিসীম কৌতুহলেরও জন্ম দেয়। রাতের আকাশের চমৎকারিত্ব ও রহস্য আদিকাল থেকেই মানুষকে বিস্মিত ও আকৃষ্ট করেছে। রাতের আকাশে জোনাকিপোকার মতো জ্বলতে থাকা নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞানীরা শুধু মুুুগ্ধ-ই হননি, আকাশে দৃশ্যমান বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু (celestial objects) সম্পর্কে জানার জন্য বিজ্ঞানীরা অবিরত আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা তাই সবসময় পরিবর্তিত হচ্ছে। মহাবিশ্বের সৃষ্টি, মহাবিশ্বের বিভিন্ন বস্তু যেমন- গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা, গ্যালাক্সি, ইত্যাদি এবং বিভিন্ন ঘটনা মানুষের মনে এখনো বিস্ময় সৃষ্টি করে।

    এই ইউনিভার্স বা মহাবিশ্ব বিষয়টা আসলে কী?? সে আসলে ঠিক কতটা বড়?? আর সময়ের সাথে সাথে যদি সে প্রসারিতই হতে থাকে তবে সময়কে পিছিয়ে দিলে সে ঠিক কোথায় গিয়ে পৌছাবে? যদি এই দুনিয়ার সকল বস্তুই পরমানু দিয়ে সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে পরমানু বা এটম সৃষ্টি হলো কীভাবে? আর সময়ের গতি যদি সবসময় উর্ধ্বমূখী হয়ে থাকে, তবে তার সূচনা হলো কবে? তার সূচনার আগে কি ছিলো? মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন শব্দ কোনটি? এখন যদি সে শব্দ আপনি শুনতে পান তবে কেমন অনুভুতি হবে? আজকে আপনাদের নিয়ে পারি দেওয়ার চেষ্টা করবো সময়ের সবচেয়ে দীর্ঘ এক যাত্রায়। উত্তর খোজার চেষ্টা করব এই সাড়া জাগানো প্রশ্নগুলোর।


    আমাদের চারপাশের সকল বস্তুর উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে হলে আমাদেরকে অনেকটা পিছিয়ে পৌছে যেতে হবে ঠিক সেই সময়টাই, যখন সময়েরই কোনো অস্থিত্ব ছিলো না। যার কিছুক্ষন পরেই শুরু হতে চলেছে এই মহা সৃষ্টি জগতের। আমাদেরকে পিছিয়ে চলে যেতে হবে আজকে থেকে প্রায় ১৩.৭৯৯০২১ বিলিয়ন বছর আগে। And at that time, there was NOTHING! কিচ্ছু ছিলো না। তখন না ছিলো কোনো স্থান, না ছিলো কোনো সময় আর না ছিলো কোনো আলো!! কিন্তু তার পরই হঠাৎ "কোনো এক সময়, কোনো এক কারণে" একটা ছোট্ট আলোর বিন্দু ধপ করে জ্বলে উঠলো। অত্যন্থ উত্তপ্ত এই আলোক বিন্দুটার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এই ইউনিভার্সের যাবতীয় রসদ। সমগ্র স্থান আর সকল বস্তু। সেই থেকেই কসমিক ক্লক টিক টিক করে উঠলো! ছুটতে শুরু করলো সময়। আর স্থান? সে শুরূ করলো তার এই মহাজাগতিক প্রসারণ। আর এটাই ছিলো literally the beginning of the time, the beginning of Everithing। সমস্ত কিছুর সূচনা।


    ভাবতে পারেন এই বিশাল পরিব্যাপ্ত মহাবিশ্ব একটা সময় একটা পরমানুর থেকেও ক্ষুদ্র অবস্থায় ছিলো? আশ্চর্যজনক তাই না? তবে হ্যাঁ, এই আশ্চর্যজনক বিষয়টাই আমাদের সামনে এসছে অনেক পরে। আমেরিকান এস্ট্রোনোমার ড. এডউইন পাওয়েল হাবলের সৌজন্যে। তার পর্যবেক্ষনের মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি আমাদের চারপাশে থাকা অন্যান্য সকল গ্যালাক্সি বা ছায়াপথগুলো সময়ের সাথে সাথে পরস্পর থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু মুখ ফসকে বলে দিলেই তো হলো না! যে আমাদের মহাবিশ্বের একটা গ্যালক্সি থেকে আরেকটা গ্যালাক্সি দূরে সরে যাচ্ছে বা মহাবিশ্বের প্রসারণ ঘটছে! তার পিছনে উপযুক্ত প্রমাণ এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তি তো থাকতে হবে, তাই না? মহাবিশ্ব প্রসারণের সেই যুক্তিটাই দেখিয়েছিলেন ড. এডউইন পাওয়েল হাবল! 


    জ্যোতির্বিজ্ঞানী হাবল! যেই পদ্ধতিতে আমাদের মহাবিশ্বের প্রসারণ লক্ষ করেছিলেন, সেই পদ্ধতিটিকে বলা হয় ডপলার শিফট। আমরা জানি আলো এক ধরণের তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ। এই তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর নির্ভর করে আমরা বিভিন্ন রঙের আলো দেখতে পাই। সবচেয়ে বেশি তরঙ্গদৈর্ঘের আলোটাকে আমরা লাল রঙের দেখি আর সবচেয়ে কম তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলোটাকে নীল রঙের দেখি।(যদিও বেগুনী আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সব থেকে কম তারপরও আমাদের চোখ বেগুনী রঙের তুলনায় নীল আলোর প্রতি একটু বেশিই সংবেদনশীল।) আর সাদা আলো হচ্ছে আমাদের দৃশ্যমান সবগুলো আলোর মিশ্রণে তৈরি এক যৌগিক আলো। আমাদের স্বাপেক্ষে কোনো একটা আলোক উৎস যদি গতিশীল থাকে তাহলে আমাদের কাছে মনে হবে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে গেছে, এটাকেই বলা হয় ডপলার শিফট। কোনো একটা উৎসের আলো যেই রঙেরই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আমাদের চোখে যেই তরঙ্গদৈর্ঘ্যটা এসে পোছোবে আমরা উৎসটাকে সেই রঙেরই দেখতে পাবো। আলোক উৎসটি যদি আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে তাহলে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য কিছুটা বেড়ে যাবে। ফলে আমাদের কাছে উৎসটি থেকে আলোকে লাল রঙের বলে মনে হবে। এটাকে বলা হয় রেড শিফট। আবার যদি আলোক উৎসটি যদি আমাদের কাছে আসতে থাকে তাহলে তার তরঙ্গ সংকুচিত হয়ে যাবে। ফলে আমাদের কাছে উৎসটি থেকে আসা আলো নীল রঙের বলে মনে হবে আর এটাকেই বলা হয় ব্লু শিফট। এভাবে কোনো একটা উৎস থেকে আসা আলো বিশ্লেষণ করে আমরা তার গতিবেগ এবং সেটি কোনদিকে ছুটে চলছে সেটিও বের করে ফেলতে পারি। এতোক্ষন আমরা ডপলার শিফট সম্পর্কে জানলাম এবার হাবল স্যারের কাছে আবার ফিরে যাওয়া যাক। 


    তো, আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী হাবল আমাদের মহাকাশের গ্যলাক্সিগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য তার টেলিস্কোপ দিয়ে একটি একটি করে গ্যালক্সি দেখতে থাকেন। গ্যালাক্সিগুলো থেকে যেই আলো আসে সেই আলোকে বিশ্লেষণ করে তিনি সেগুলোর গতিবেগ বের করতে লাগলেন। আমরা আগেই জানলাম কোনো উৎস থেকে আসা আলোর বর্ণ বিশ্লেষণ করে আমরা উৎসের গতিবেগ বের করে ফেলতে পারি। এভাবেই হাবল দেখলেন একটি গ্যালক্সি যত বেশি দূরে সেটি তত বেশি বেগে ছুটে দূরে সরে যাচ্ছে। আর তারা যতই দূরে সরছে ততোই তাদের  বেগ ও বৃদ্ধি পাচ্ছে [আসলে গ্যালাক্সিগুলো দূরে সরে যাচ্ছে না, সেটি যেই জায়গায় আছে সেই জায়গাটি প্রসারিত হচ্ছে]।সেই থেকেই বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন আমাদের এই ইউনিভার্স ক্রমস প্রসারিত হচ্ছে। আর এটা মাথায় আসার সাথে সাথেই অন্য আরেকটি ধারণাও বিজ্ঞানীদের মাথা সাড়া দিয়ে উঠলো। যদি ইউনিভার্স সময়ের সাথে সাথে প্রসারিতই হতে থাকে, তবে সময়কে পিছিয়ে দিয়ে অতীতে চলে গেলে কোনো একটা সময় সে নিশ্চয় অনেকটা ছোট ছিলো। অনেক, অনেকটা ছোট্ট। আর তার সূচনা কালে সে নিশ্চয় একটা পরমানুর থেকেও ছোট ছিলো। এবং তখন বিজ্ঞানীদের মাথায় প্রথমবারের জন্য একটি থিওরির জন্ম নিল। দ্যা বিগব্যাং থিওরি!!! 

বিগ ব্যং। মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য!
ছবিঃ বিগ ব্যাং মডেল

    অনেকে মনে করে থাকেন বিগব্যাং থিওরিটা মহাবিশ্বের সূচনাকে ব্যাখ্যা করে। এটা কিন্তু ভুল, থিওরিটিকাল এস্ট্রো ফিজিসিস্ট ডেভিড ন্যাথেনিয়েল স্পার্গেল বলেছেন-

The Big Bang Theory is not really a theory of how the universe began. It's really a theory of how the universe evolved.

অর্থাৎ তার বক্তব্য অনুসারে-

বিগব্যাং থিওরি দিয়ে ইউনিভার্স কিভাবে সৃষ্টি হলো আমরা তা ব্যাখ্যা করতে পারি না, বিগব্যাং থিওরির মাধ্যমে আমাদের এই ইউনিভার্স কিভাবে বেড়ে চলল, তার বিকাশ কিভাবে হলো তা জানতে পারি।

 

    সত্যি বলতে কি, আমরা মহাবিশ্ব সৃষ্টির এক্সাক্ট মুহুর্ত সম্পর্কে জানি না, কিন্তু তার ক্ষাণিক পরের মুহুর্তের কথা জানি। মানে,  মহাবিশ্বের বয়স যখন 10^-41 সেকেন্ড আমরা সেই সময়টার কথা জানি। তার আগের মূহুর্তটা সম্পর্কে আমরা এখনোও কিছু জানি না। মহাবিশ্ব সৃষ্টির 10^-41 সেকেন্ড পার হওয়ার আগে ব্যবহার করার মতো বিজ্ঞান এখনো বের হয়নি। তবে এই সময়টা এতোটাই কম সময় যে এটা আমরা অনুভবই করতে পারি না। যদিও তখন আমাদের মহাবিশ্ব অনেকটা ইয়ং, তবুও কিন্তু এই সময়টা একেবারে শূন্য না।


    প্রচন্ড উত্তপ্ত এই ইউনিভার্স তখন যেকোনো ছোট্ট শিশুর মতোই অত্যন্ত চঞ্চল, অত্যন্ত ছটফটে এবং ভীষণ রকমের অস্থিতিশীল ছিলো। আর সেই সঙ্গে তার প্রসারণ হারও প্রচন্ড রকমের বেশি ছিলো। এই রেইট এতোটাই বেশি ছিলো যে তা আলোর বেগের তুলনায় ও অনেক অনেক গুন দ্রুত ছিলো। আমাদের মহাবিশ্ব জন্ম হবার পর আনুমানিক 10^-30 সেকেন্ড পর্যন্ত এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে আর সেটি হলো এক অবিশ্বাস্য প্রসারণ যাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ইনফ্ল্যাশান। ইনফ্ল্যাশনের এই প্রসারণটি ছিলো অবিশ্বাস্য থেকেও অবিশ্বাস্য রকমের। এই প্রসারণের গতি ছিলো আলোর গতির থেকেও বেশি। এই অবিশ্বাস্য থেকেও অবিশ্বাস্য প্রসারণে অর্থাৎ মহাবিশ্ব সৃষ্টির 10^-30 সেকেন্ড বা এক সেকেন্ডের বিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ সময়ে মহাবিশ্বের আকার 10^60 গুন বা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গুন বেড়ে গেলো! এই অবিশ্বাস্য অকল্পনীয় প্রসারণের পর মহাবিশ্বের আকার কতোটুকু হলো কল্পনা করতে পারবেন? তার আকার হলো একটা কমলার মতো, অর্থাৎ মহাবিশ্বের এতো অকল্পনীয় প্রসারণের পরও তার যেই আকৃতি দাড়ালো সেটা অনায়েসেই আপনার হাতের মুঠোতে ফিট করে যাবে। এবার ভাবুন তাহলে ঐ বিন্দুটা কতটুকু ছোট ছিলো। 


পরের পর্বে আমরা জানবো এই ছোট্ট শক্তির আধার থেকে কিভাবে পদার্থের সৃষ্টি হলো এবং কিভাবে এই শিশু ইউনিভার্সটা বড় হতে থাকলো।

No comments:

Post a Comment