আকাশ বলতে আসলে কি বোঝায়? আমরা দিনের বেলায় বেশি দূরের বস্তু দেখি নাকি রাতের বেলায়?

আকাশ


    সাধারণত আকাশ শব্দটি ভূপৃষ্ঠ থেকে উপরে যেকোনো বিন্দুকে নির্দেশ করতে ব্যবহার করা হয়। অর্থ ও ব্যবহারের উপর নির্ভর করে আকাশকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। যেমন- 
  • জ্যোতির্বিদ্যায় আকাশকে খ-গোলক(Celestial Sphere) ও বলা হয়। ভূপৃষ্ঠ থেকে এটিকে একটি কাল্পনিক গোলক(Sphere) কল্পনা করা হয় যেখানে সূর্য, নক্ষত্র, চাঁদ আর গ্রহসমূহকে পরিভ্রমণ করতে দেখা যায়।
  • আবহাওয়ার ক্ষেত্রে আকাশ বলতে শুধুমাত্র বায়ুমন্ডলের নিচের দিকের অধিক ঘন অংশকে বোঝায়। যেটাকে দিনের বেলায় উপরের দিকে তাকালে আমরা নীল রঙ হিসেবে দেখতে পাই।
    মূলত আকাশ হলো ভূপৃষ্ঠ থেকে বাইরের দিকে অবস্থিত অংশবিশেষ। বায়ুমন্ডল এবং মহাশূন্যও আকাশের অংশ। অর্থাৎ আমরা বলতে পারি, দিনের বেলায় বা রাতের বেলায় মাথার উপরের দিকে তাকালে আমরা যা কিছু দেখতে পাই এসবই আকাশের অংশ।

নীল আকাশ
চিত্রঃ সবুজ ঘাসের উপর সাদা মেঘের আড়ালে নীল আকাশ।


বায়ুমন্ডলঃ বায়ুমন্ডল হলো কোনো গ্রহ বা পর্যাপ্ত ভরসম্পন্ন কোনো মহাজাগতিক বস্তুর চারদিকে বেষ্টন করে থাকে গ্যাসের এক বা একাধিক স্তর যা বস্তুটি তার মহাকর্ষ শক্তি দ্বারা ধরে রাখে। বিমান ও  হেলিকপ্টার চলাচল, জলীয় বাষ্প, মেঘ, বৃষ্টির পরে রংধনু, দুপুর বেলায় মাথার উপরে আকাশের নীল রঙ এসবকিছু বায়ুমন্ডলের ভিতরেই হয়ে থাকে। আমাদের পৃথিবীর বায়ুমন্ডল সাধারণত ভূপৃষ্ঠ থেকে বাইরের দিকে ১০,০০০ কিমি. পর্যন্ত বিস্তৃত। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলকে নিন্মোক্ত স্তরগুলোতে ভাগ করা হয়।
  • ট্রপোমন্ডল (Troposphere): পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে শুরু হয়ে ৮ থেকে ১৪.৫ কিমি. পর্যন্ত বিস্তৃত। বায়ুমন্ডলের এই অংশটি সবচেয়ে বেশি ঘন। বায়ুমণ্ডলের ভরের তিন চতুর্থাংশ ট্রপোমণ্ডলের মধ্যে থাকে এবং এই স্তর পৃথিবীর পার্থিব আবহাওয়া বিকাশ করে।
  • স্ট্রাটোমন্ডল(Stratosphere): ট্রপোমন্ডল এর ঠিক উপর থেকে শুরু হয়ে ৫০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত। ওজন স্তর, যা সূর্যের আলো থেকে বিক্ষিপ্ত হওয়া অতিবেগুনী রশ্মি শোষন করে তা এই স্তরেই থাকে।
  • মেসোমন্ডল(Mesosphere): এটি স্ট্রাটোমন্ডলের উপর থেকে শুরু হয়ে ৮৫ কিমি. উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। উল্কা গুলো এই স্তরে এসেই জ্বলে উঠে। যেটা আমরা উল্কা বৃষ্টি হিসেবে দেখি।
  • তাপমন্ডল(Thermosphere): এটি মেসোমন্ডলের উপর থেকে শুরু করে ৬০০ কি.মি. উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। নিম্ন কক্ষপথের স্যাটেলাইটগুলো এই স্তরেই থাকে।
  • আয়নমন্ডল(Ionosphere): এই স্থরটিতে প্রচুর পরিমাণে ইলেক্ট্রন আর আয়নিত বিভিন্ন অণু পরমাণু থাকে যা ভূপৃষ্ঠের উপরে ৪৮ কি.মি. উপর থেকে প্রায় ৯৬৫ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি মেসোমন্ডল ও তাপমন্ডলের মাঝে ওভারলেপিং অবস্থায় থাকে।
  • এক্সোমন্ডল(Exosphere): এটা আমাদের বায়ুমন্ডলের সবচেয়ে উপরের স্থর. এটি তাপমন্ডলের  উপর থেকে ১০,০০০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত।

মহাশূন্যঃ বায়ুমন্ডলের পর থেকেই অসীম মহাশূন্যের শুরু। ডার্ক এনার্জি, ডার্ক ম্যাটার, রেগুলার ম্যাটার, তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণ, নিউট্রিনো, মহাজাগতিক ধূলি সম্বলিত বেশিরভাগ হাইড্রোজেন আর অল্পপরিমাণে হিলিয়াম প্লাজমা নিয়ে গঠিত আমাদের এই মহাশূন্য। এই মহাশূন্যেই অবাধে বিচরণ করে চলেছে বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু, গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ ইত্যাদি।

দিনের আকাশঃ

দিনের আকাশ
ছবিঃ দিনের আকাশ

    
দিনের বেলায় পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে আলোক রশ্মির বিক্ষেপণের ফলে আমরা আমাদের বায়ুমন্ডলে নীল দেখি। আমরা জানি আলো এক প্রকার তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ। তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর ভিত্তি করে আমরা কোনো রঙকে আলাদা করে দেখতে পাই। কোনো আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত কম হয়, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণিকা দ্বারা তার বিক্ষেপণ তত বেশি হয়। দৃশ্যমান আলোর সাতটি রঙের মাঝে বেগুনী আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সব থেকে কম তারপর নীল আলোর। সেক্ষেত্রে সূর্যের সাদা আলো যখন আমাদের বায়ুমন্ডল ভেদ করে আসতে থাকে, তখন বায়ুমন্ডলে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্যাসীয় নাইট্রোজেন আর অক্সিজেন কণা দ্বারা নীল এবং বেগুনী আলো সব থেকে বেশি বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পরে।

    মানুষের রেটিনায় রড এবং কোন নামে দু ধরণের কোষ থাকে। এদের মাঝে রড কোষ আলোর তীব্রতার প্রতি সংবেদনশীলতা সৃষ্টি করে এবং কোন কোষ ভিন্ন রঙের আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা সৃষ্টি করে। কোন কোষ অন্যান্য রঙের চেয়ে লাল, নীল এবং সবুজ আলোতে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীলতা দেখায়। এই কোন কোষগুলোর বিভিন্ন অনুপাতের সংবেদনশীলতার সমন্বয়েই আমরা ভিন্ন ভিন্ন রঙ দেখে থাকি। আমাদের চোখের কোষগুলি বেগুনী আলোর প্রতি সংবেদনশীল না। এজন্যই আমাদের কাছে আকাশকে গাঢ় বেগুনী বলে মনে হয়না বরং নীল বলে মনে হয়।

    মূলত দিনের বেলা আমরা যেই নীল আকাশ দেখতে পাই এটা শুধুমাত্র আমাদের বায়ুমন্ডলকেই দেখি। সূর্যের আলোর তীব্রতার জন্য আকাশের তারা গুলোকে আর দেখতে পাই না। 

রাতের আকাশঃ

    রাতের আকাশে সূর্যের আলো থাকে না। ফলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্যাসীয় কণা গুলো আলো শোষণ করে বিক্ষিপ্ত করতে পারে না। কাজেই আমাদের বায়ুমন্ডল তথা সমগ্র মহাকাশকেই কালো দেখি। যেহেতু রাতের আকাশের বায়ুমন্ডল আলোকিত হচ্ছে না তাই আমরা বায়ুমন্ডল পেরিয়েও কয়েক আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রগুলোকেও দেখতে পাই। 

     আমাদের নিকটতম নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টরাই এর দূরত্ব ৪.২৩ আলোকবর্ষ দূরে। যেটা আমরা খালি চোখে দেখতে পাই। রাতের আকাশে আমরা যেই তারা গুলো দেখতে পাই। এগুলোর দূররত্ব কয়েক আলোকবর্ষ থেকে শুরু করে কয়েক হাজার আলোকবর্ষ পর্যন্ত হয়ে থাকে। কাজেই আমরা কিন্তু দিনের বেলা থেকে রাতের বেলা মহাকাশের বেশি দূরত্ব দেখতে পাই।  

রাতের আকাশ
ছবিঃ রাতের আকাশ

No comments:

Post a Comment