মহাকর্ষের আধুনিক ব্যাখ্যা | জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি।

জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি


Space Time Curvature
Space Time Curvature


    রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতা শব্দটির সাথে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। জনপ্রিয় পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের নাম শুনা মাত্রই সর্বপ্রথম যেই শব্দটি আমাদের মাথায় আসে তা হলো এই রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতা। আইনস্টাইন নামটির সাথে রিলেটিভিটি শব্দটি যেন একদম মিশে গিয়েছে। তিনি আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া সম্পর্কিত গবেষণার জন্য ১৯২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করে যতোটা না পরিচিতি লাভ করেছেন, তার থেকেও বেশি জনপ্রিয় হয়েছেন তার বিশ্ব বিখ্যাত থিওরি অফ রিলেটিভিটি তত্বের মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত পাওয়া থিওরি গুলোর মধ্যে আমাদের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই জনপ্রিয় এই 'থিওরি অফ রিলেটিভিটি' যাকে 'আইনস্টাইনের: সাধারণ আপেক্ষিকতার সূত্র' বলা হয় তা বোধগম্য হয় না। আজকে আমরা এই জটিল বিষয়টিকেই সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করবো। এর জন্য আপনাকে তেমন কোনো গাণিতিক সূত্র জানা লাগবে না। শুধুমাত্র চিন্তাশক্তিটা ঠিকঠাক ভাবে কাজে লাগাতে পারলেই হবে।


আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা বোঝার আগে মহাকর্ষ বল সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়া যাক।


    আচ্ছা বলুন তো, মহাকর্ষ কাকে বলে? সাধারণভাবে আমরা জানি, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু পরস্পরকে যে বলে আকর্ষণ করে, তাকেই মহাকর্ষ বল বলে। এই আকর্ষণ বলের জন্যই পৃথিবী ঘুরছে সূর্যের চারপাশে, চাঁদ ঘুরছে পৃথিবীর চারপাশে, অন্য গ্রহ-নক্ষত্রও চলছে তাদের নিজ নিজ কক্ষপথে।



    সপ্তদশ শতাব্দীতে মহাকর্ষ সম্পর্কিত এই সূত্রটি দিয়েছিলেন আমাদের সবার অতি পরিচিত বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন। তিনি ১৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দে তার ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা গ্রন্থে এ বিষয়ে পূর্ণ ধারণা প্রদান করেন৷


    বিংশ শতাব্দীতে এসে মহাকর্ষ নিয়ে আরেকটি তত্ত্ব দেন বিজ্ঞানী স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। এই তত্ত্বটিকে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব বা জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি বলা হয়।


কিন্তু নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব থাকার পরেও আইনস্টাইন আবার নতুন করে মহাকর্ষ তত্ত্ব দিলেন কেন? নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব কি তাহলে ভুল ছিলো? আমরা কি তাহলে নবম-দশম আর একাদশ শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান বইয়ে এতোদিন মহাকর্ষ বল সম্পর্কে ভুল জেনে আসছি?


    আসলে ১৯০৫ সালের আগে নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বকে নিয়ে কোনো সমস্যা ছিলো না। কিন্তু ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন যখন তার স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটিতে বলেছিলো যে, এই মহাবিশ্বে আলোর বেগই সর্বোচ্চ বেগ অর্থাৎ কোনো কিছুর বেগই আলোর বেগকে অতিক্রম করতে পারবে না, তখনই নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বের মধ্যে কিছু সমস্যা দেখা দেয়।


    এই সমস্যাটা বুঝতে হলে আমাদেরকে একটু কল্পনা করতে হবে এবার। আমরা জানি যে, সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার এবং আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে ৩ লক্ষ ৮৬ হাজার কিলোমিটার। সেই হিসেবে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো পৌছাতে মোট সময় লাগে প্রায় ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড এর মতো। এখন ধরে নেই যে, এই মুহুর্তে কোনো কারণে হঠাৎ সূর্য ধ্বংস বা গায়েব হয়ে গেলো। তাহলে কি ঘটবে ভেবে দেখুন তো!


    আগেই বলেছি সূর্য থেকে আলোর পৃথিবীতে পৌছাতে লাগবে প্রায় ৮ মিনিট, আর আমরা একটি বস্তুকে তখনই দেখতে পাই যখন বস্তুটা থেকে আলো আমাদের চোখে এসে পরে। এখন নিউটনের মহাকর্ষবলের তত্বটি আরেকবার মনে করে দেখুন, সেখানে বলা আছে ভরযুক্ত সকল বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে, কাজেই মহাকর্ষ বল ততক্ষনই থাকবে যতক্ষন পর্যন্ত বস্তুটি তথা ভরের অস্তিত্ব থাকবে। যখন বস্তুর অস্তিত্ব থাকবে না তখন স্বাভাবিক ভাবেই মহাকর্ষ বলেরও অস্তিত্ব থকাবে না। কাজেই নিউটনের মহাকর্ষ বলের মতবাদ অনুযায়ী সূর্যের গায়েব হবার সাথে সাথেই তাৎক্ষণিকভাবে পৃথিবীর উপর সূর্যের মহাকর্ষ বল ক্রিয়া করা বন্ধ করে দেবে। এখানেই আসল সমস্যা। কারণ যে দূরত্ব অতিক্রমে আলোর লাগে প্রায় ৮ মিনিট, সেখানে মহাকর্ষের কোনো সময়ই লাগে না। তাহলে তো একটি বস্তুর উপর মহাকর্ষের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে ক্রিয়া করে; দূরত্ব যাই হোক না কেন!! এখানেই বাধলো সমস্যা। কারণ বিশেষ আপেক্ষিকতায় আইনস্টাইন বলেই দিয়েছে যে, আলোর বেগই সর্বোচ্চ বেগ; আমাদের মহাবিশ্বের কোনো কিছুরই এর থেকে বেশী গতি পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব যদি সঠিক হয় তাহলে তো মহাকর্ষ অনেক সহজেই আলোর গতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ যে দূরত্ব অতিক্রম করতে আলোর ক্ষেত্রে লাগে ৮ মিনিট, সেখানে মহাকর্ষ বলের কোনো সময়ই লাগে না!! সুতরাং অবশ্যই নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব পুরোপুরি সঠিক নয়।


    যেহেতু মহাকর্ষ বল, আলোর বেগকে অতিক্রম করার কথা নয়, সেহেতু মহাকর্ষ নিশ্চয় গতিশীল কিছু না। অর্থ্যাৎ মহাকর্ষ কোনো ধরনের আকর্ষণ বল নয়। মহাকর্ষ হলো অন্যকিছু।


    সেই অন্যকিছুকে নিয়ে ব্যাপক ভাবনার পরেই ১৯১৫ সালে আইনস্টাইন সাধারন আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশ করেন। যার দ্বারা সেই অন্যকিছুকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
এছাড়াও আরো অনেক টেকনিক্যাল এরর থাকার কারণে আইনস্টাইন নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা আর সমস্যাগুলো দূর করার জন্য কাজ শুরু করলেন। তারই ফলস্বরুপ ১৯১৫ সালে তিনি আবিষ্কার করে ফেলেন জগতবিখ্যাত সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব। আর মুটামুটি এটাই ছিলো সাধারণ আপেক্ষিকতা আবিষ্কারের ইতিহাস।


    চলুন এবার আমরা বুঝার চেষ্টা করে দেখি যে, জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী মহাকর্ষটা আসলে কী? এটা কি সত্যিই কোনো ধরণের বল, না-কি অন্যকিছু?


    এটা বোঝার জন্য আগে অবশ্য আমাদের জানতে হবে স্থানকাল বা স্পেস-টাইম কী?


    আগে আমরা সবাই ভাবতাম যে আমাদের পুরো মহাবিশ্বটা হলো ত্রিমাত্রিক মানে শুধু দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতাবিশিষ্ট। কিন্তু আইনস্টাইনের মতে আমাদের মহাবিশ্ব হলো চতুর্মাত্রিক অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা আর সময়কে নিয়ে গঠিত। আর এই স্থানের তিন মাত্রা আর সময়ের একমাত্রাকে মিলিতভাবে একসাথে বলে স্থানকাল বা স্পেস-টাইম। সোজা কথায় চতুর্মাত্রিক এই মহাবিশ্বের প্রতিটা অংশই হলো স্থানকাল (Space-time)।


    স্থানকাল বা স্পেস টাইম সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা পাওয়া গেল। এবার আপেক্ষিকতায় ফিরে যাওয়া যাক।


    আইনস্টাইনের ধারণা মতে, স্পেস টাইম বা স্থান-কাল আমাদের সমগ্র মহাবিশ্বজুড়ে চাদরের মতো ছড়িয়ে আছে। যখন একটা বস্তুকে আমরা মহাকাশে স্থাপন করব তখন সেই বস্তুটা তার চারপাশের স্থান-কালকে বাকিয়ে ফেলবে। কোনো একটি বস্তুর কারণে স্থানকালের যে ধরণের বক্রতা তৈরী হয় তাকেই বলে স্থানকালের বক্রতা বা Space-time Curvature। জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী, কোনো বস্তুর উপর স্থানকালের বক্রতার প্রভাবই হলো মহাকর্ষ আর এই প্রভাব কোনো প্রকার আকর্ষণবল নয়। কোনো একটি বস্তুকে মহাকাশে স্থাপন করলে বস্তুটি শুধুমাত্র তার চারপাশের স্থান বা স্পেসকেই বাকিয়ে ফেলে না বরং সময়কেও বাকিয়ে ফেলে। এইকারণে স্থানকালের বক্রতার কারণে সময় ধীরে চলে, একে বলা হয় মহাকর্ষীয় কাল দীর্ঘায়ন বা Gravitational Time dilation। আবার একইভাবে কোনো একটি বস্তুর স্থানকালের বক্রতার ফলে বস্তুটির চারপাশের স্পেস বা স্থানও বেকে যায়। এখন যদি কোনো বস্তু যথেষ্ট শক্তিশালী স্থানকালের বক্রতা তৈরী করতে পারে তাহলে বস্তুটি তার চারপাশের স্থানকে বা স্পেসকে এমনভাবে বাকিয়ে দেয় যে, কোনোকিছু এমনকি আলোও তা থেকে বের হতে পারে না। কারন তখন বস্তুটির চারপাশের স্পেস এমনভাবে বেকে যায় যে, যাই এর ভেতরে একবার ঢোকে তা বার বার একই জায়গায় ফিরে আসে; ফলে তা কখনো বের হতে পারে না। যেমন ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রে হয়। ব্ল্যাকহোল তার চারপাশের স্পেসকে এমনভাবে বাকিয়ে দেয় যে, যা এর ভেতরে একবার ঢোকে তা কখনো বের হতে পারে না।


    এখন হয়তো আপনাদের মনে খুব স্বাভাবিক ভাবেই একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে, আমরা জানি বল প্রয়োগ ছাড়া কোনো বস্তুকে কখনো গতিশীল করা সম্ভব নয়। তাহলে মহাকর্ষ যদি কোনো আকর্ষণবল বা কোনোধরণের বল না হয়, তাহলে সূর্য কীভাবে বল প্রয়োগ না করে পৃথিবীকে এর চারপাশে অনবরত ঘুরাচ্ছে??


    এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদেরকে আবার নিউটোনের কাছে ফিরে যেতে হবে। আমরা এই বিষয়ে নিউটনের গতির ১ম সূত্রটা থেকে জানতে পারি। সেখানে বলা হয়েছে যে, যদি বাহ্যিক কোনো বল প্রয়োগ করা না হয় তাহলে গতিশীল বস্তু চিরকাল সুষম গতিতে চলতেই থাকবে। এখন, আমরা জানি যে পৃথিবী গতিশীল; এই গতিটা হবার কথা ছিল সরলরৈখিক বা সোজা। কিন্তু যেহেতু সূর্যের স্থানকালের বক্রতার জন্য সৌরজগতের স্পেস বেকে গেছে, সেই জন্য পৃথিবীর গতিও হয়েছে বাকা বা বক্র। এখন যেহেতু জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী, মহাকর্ষ কোনো আকর্ষণবল নয় সেহেতু পৃথিবীর উপর কোনো বাহ্যিক বল কাজ করছে না। এখন, অতীতে যে পরিমাণ বল পৃথিবীকে সূর্যের স্থানকালের বক্রতার ভেতরে নিয়ে এসেছে, সেই বলই এখন পৃথিবীকে সূর্যের চারপাশে ঘুরতে বাধ্য করছে কারণ এখনো সেই বলটি কার্যকর রয়েছে যেহেতু বলটিকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য সেখানে কোনো বাহ্যিক বল নেই। আমরা এখনো বলি যে, সূর্যের আকর্ষণের কারণে পৃথিবী তার চারপাশে ঘোরে এটা ভূল। কারন সূর্যের স্থানকালের প্রভাবের কারণেই পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে। এখন বুঝেছ মহাকর্ষ কী আর কীভাবে বল প্রয়োগ না করে মহাকর্ষ কোনো বস্তুকে এর চারপাশে ঘুরতে বাধ্য করে.


    কোনো একটি বস্তুর স্থানকালের বক্রতার ভেতরে যদি অন্য কোনো বস্তু প্রবেশ করে তাহলে বস্তুটি স্থানকালের বক্রতার প্রভাবে ১ম বস্তুটির চারপাশে ঘুরতে থাকে। আর এক্ষেত্রে ২য় বস্তুটির উপর যেহেতু কোনো বাহ্যিক বল কাজ করেনা সেহেতু প্রথমে বস্তুটি যে প্রযুক্ত বলের কারণে ১ম বস্তুর স্থানকালের বক্রতায় প্রবেশ করেছিলো সেই বলই ২য় বস্তুটিকে গতিশীল করে এবং যেহেতু স্থানকালের বক্রতার ভেতর স্থান বা স্পেস হয় বাকা সেই জন্যই ২য় বস্তুটি ১ম বস্তুর চারপাশে ঘুরতে বাধ্য হয়। এখন, কোনো বস্তুর উপর স্থানকালের বক্রতার প্রভাবই হলো মহাকর্ষ।


    একটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা আরেকটু সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যাক।


    আপনি একটা চাদর নিন। এবার আপনার আরও তিনজন বন্ধু সহ চারজন চারকোনা ধরে এটাকে উপরে তুলে রাখুন। এবার একটা লোহার বল চাদরের মাঝখানে রেখে দিন। কি দেখতে পাবেন আপনি?


    দেখা যাবে যে, চাদরের মাঝখানটি নিচের দিকে বসে গিয়েছে (বি.দ্র. পৃথিবীতে এটা ওজনের কারনে নিচের দিকে বসলেও মহাবিশ্বে সেটার কারন কিছুটা ভিন্ন।)। যেহেতু মহাবিশ্বের সব জায়গায় স্থানকাল, তাই সেখানে কোন ভারী বস্তু থাকলে সেখানেও চাদরের মতো বক্রতা তৈরী হবে। স্থানকালের উপর প্রতিটি ভারী বস্তুর জন্য এই ঘটনা ঘটবে। কোন ভারী বস্তুর জন্য স্থানকালে তৈরী এই বক্রতাকে স্থানকালের বক্রতা বা Space-time curvature বলা হয়। এতটুকু নিশ্চয়ই বুঝেছেন?


    চাদরের মাঝখানে বল রাখার পরে সেখানে বক্রতার সৃষ্টি হয়েছিল। এবার একটা ছোট মার্বেল নিয়ে চাদরের চারপাশে ঘূর্ণন পথে গতি দিয়ে চালিয়ে দিন। দেখা যাবে, মার্বেলটি ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে কেন্দ্রে পড়েছে। কিন্তু সেই চাদর ভেদ করে বাইরে যাবার ক্ষমতা মার্বেলটির নাই। তবে চাদরকে মহাবিশ্বের সাথে তুলনা করলে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, চাদরটি দ্বিমাত্রিক এবং ঘর্ষণযুক্ত বস্তু কিন্তু মহাকাশ চতুর্মাত্রিক এবং ঘর্ষণহীন।


    এবার আমরা চাদরের জায়গায় মহাকাশের কোন জায়গার স্থানকাল, লোহার বলটিকে খুব ভারী বস্তুু (যেমনঃ সূর্য) ও মার্বেলটির জায়গায় কম ভারী বস্তুু (যেমনঃ পৃথিবী) কে কল্পনা করি।


    মহাকাশ ঘর্ষণহীন হবার জন্য, আর ভারী বস্তুটির স্থানকালের বক্রতার জন্য কম ভারী বস্তুটি অনবরত ঘুরতেই থাকবে। এই জন্যই পৃথিবী সূর্যের চারপাশে, চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে।


    আর সাধারন আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে কোন বস্তুর উপর স্থানকালের বক্রতার প্রভাবই মহাকর্ষ।


    আমরা যদি কোন বস্তুর চারপাশে অন্য বস্তুকে ঘোরাতে চাই তবে সেই বস্তুর স্থানকালের বক্রতা অপরটির তুলনায় শক্তিশালী হতে হবে।


    তাই মহাকর্ষ মূলত স্থানকালের বক্রতার জন্য সৃষ্ট একটা বাঁকা পথ, কোন আকর্ষণবল নয়।

একটা মজার ব্যাপার হলো, দুটি বস্তুর মধ্যে যার ভর বেশী হবে তার স্থানকালের বক্রতার প্রভাবও আরো শক্তিশালী বা বেশী হবে। আর যদি ২য় বস্তুকে ১ম বস্তু ঘোরাতে চায় তাহলে ১ম বস্তুর যথেষ্ট শক্তিশালী স্থানকালের বক্রতা থাকতে হবে।


স্থানকালের বক্রতার প্রভাব কী সবকিছুর উপরই কার্যকর?


    হ্যাঁ। বস্তুর ভর হোক বা হোক, প্রতিটা বস্তুই স্থানকালের প্রভাবে প্রভাবিত হবে। যেমন আলো। আলোর কোনো ভর নেই তবু আলোও স্থানকালের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে সরলপথের জায়গায় বক্র পথে যায়। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, যখন অন্য কোনো নক্ষত্রের আলো সূর্যের পাশ দিয়ে যায় তখন সামান্য হলেও সূর্যের স্থানকালের বক্রতার প্রভাবে আলো বাকা পথে যায়। স্থানকালের বক্রতার প্রভাবে আলোর এই সরলপথের জায়গায় বক্রপথে যাওয়াকে গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং বলে। এই গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং এর জন্য আমরা মহাকাশে কোনো বস্তুর প্রকৃত অবস্থান দেখতে পারি না; অর্থাৎ মহাকাশে আমরা কোনো বস্তুর যে অবস্থান পর্যবেক্ষণ করি তা সেই বস্তুটির প্রকৃত অবস্থান নয়!!
এখন একটা প্রশ্ন আসতে পারে আমরাতো পড়েছিলাম যে আলো সবসময় সরলপথেই যায়। তাহলে আবার আলো বাকা পথে কীভাবে যেতে পারে?


    এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, সূর্যের স্থানকালের বক্রতার প্রভাবে এর চারপাশের স্পেসও বেকে গেছে। এখন কোনো আলো যখন সূর্যের পাশ দিয়ে যাবে তখন তার কাছে সূর্যের চারপাশের ওই বাকা স্পেস বা স্থান দিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায়ই নাই। এইজন্য এক্ষেত্রে বাকা বা বক্র পথে যেতে আলো বাধ্য।


আরও পড়ুনঃ 

No comments:

Post a Comment