ISS, International Space Station বা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন, যেই নামেই ডাকা হোক না কেন এই নামটা শুনার পর পরই মনের ভিতর এক অসীম বিস্তৃতির কৌতুহলের সৃষ্টি হয়।
মাইক্রোগ্র্যাভিটি-তে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নীরিক্ষা ও মহাকাশ গবেষণার কাজে নিয়োজিত মহাকাশচারী সমেত এই মহাকাশ স্টেশনটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪০০ কি.মি গড় উচ্চতার Low Earth Orbit(LEO) এ প্রায় ১৭,৬০০ কি.মি/ঘন্টা বেগে প্রতি ৯২ মিনিটে একবার করে একদিনে মোট ১৬ বার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে!
একজন মহাকাশচারী গড়ে ৬ মাস সেখানে থাকার সুযোগ পেয়ে থাকেন। তবে একজন একাধিকবার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে গবেষণার জন্য যেতে পারেন। তাদের সেখানে যাওয়া আসার জন্য আগে রাশিয়ার Soyuj Rocket ব্যবহার করা হতো, যেটি দিয়ে প্রত্যেক বার ৩ জন করে মহাকাশচারী যাতায়াত করতে পারতো। বর্তমানে মহাকাশচারী সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ISS এ আনা নেওয়ার জন্য Elon Musk এর রকেট কোম্পানি SpaceX এর পুনরায় ব্যবহারযোগ্য Falcon 9 রকেট এবং Dragon Spacecraft ব্যবহার করা হচ্ছে। রকেট লঞ্চ থেকে শুরু করে Spacecraft টিকে ISS এর সাথে ডকিং সহ মহাকাশ স্টেশনের ভিতরে মহাকাশচারীরা কিভাবে এত প্রতিকূলতার সাথে মানিয়ে নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে সেটা NASA এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেলে লাইভ দেখানো হয়। আপনি যদি সেই লাইভ ভিডিও গুলো দেখে থাকেন তাহলে খেয়াল করে থাকবেন যে, আমরা পৃথিবী পৃষ্ঠে যেভাবে পায়ে হেটে চলাফেরা করতে পারি সেখানে মহাকাশচারীরা তা পারে না। তারা সেখানে ভেসে বেড়ায়। এটা দেখার পর আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, তারা কেন এমন ভেসে বেড়ায়? নিজেকে ওজনহীন মনে করে কেন? আর কেনই বা তারা সেখানে পায়ে হেটে চলতে পারে না? তাদের উপর কি মধ্যাকর্ষণ বল কাজ করে না?
![]() |
| Crew portrait in the Kibo laboratory of the International Space Station. |
মহাকাশচারীরা কেন ওজনহীন অনুভব করে সেটি জানার আগে, আমরা কোথায় কোথায় এবং কি কি শর্তে নিজেকে ওজনহীন অনুভব করতে পারি সেটি জেনে আসা যাক।
- পৃথিবীর পৃষ্ঠে আমরা ওজন অনুভব করি, কারণ- পৃথিবীর মধ্যাকর্ষন আকর্ষণ বলের জন্য ভূপৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় আমাদের দ্বারা যে বল প্রয়োগ করা হয় ভূপৃষ্ঠও প্রতিক্রিয়া বল হিসেবে সমপরিমাণ বল আমাদের উপর প্রয়োগ করে। এজন্যই আমরা আমাদের ওজনটা অনুভব করতে পারি। ওজন মাপার যন্ত্রের উপর দাঁড়ালেও একই কাজটাই হয়, আমরা ওজন মাপার যন্ত্রে আমাদের ভর আর পৃথিবীর মধ্যাকর্ষন বলের জন্য একটা বল প্রয়োগ করি(F = mg), তখন ওজন মাপার যন্ত্রটি ভূপৃষ্ঠে স্থির থাকার ধরূন সেও আমাদের ওপর একটি প্রতিক্রিয়া বল দেয়। আর এই বল থেকেই হিসেব করে যন্ত্রটি আমাদের ভরটি জানাতে পারে। যদি পৃথিবী কর্তৃক এই প্রতিক্রিয়া বলটি না থাকতো তাহলে যন্ত্রটি আমাদের ওজন শূন্য দেখাতো।
ওজনহীন মনে হওয়ার বিষয়টা গাণিতিকভাবে দেখলে-
যেহেতু ধরে নেওয়া হয়েছে আমাদের উপর কোনো প্রতিক্রিয়া বল কাজ করছে না, কাজেই F = 0 হবে।
আমরা জানি,
F = mg
বা, m = F/g
বা, m = 0/g
বা, m = 0
অর্থাৎ তখন আমরা আমাদের ভরটা অনুভব করতে পারবো না। নিজেকে ওজনহীন বা ভরহীন মনে হবে।
এ-তো গেলো প্রতিক্রিয়া বল না থাকলে কিভাবে ওজনহীন অনুভব হয় সেই বিষয়টা। এবার মধ্যাকর্ষন বলকে নিয়ে নড়াচড়া করা যাক।
- যদি আমাদের উপর মধ্যাকর্ষন বলটা ক্রমান্বয়ে কমে যায়, তাহলে আমাদের দ্বারা পৃষ্ঠে বল প্রয়োগ ও কমে যাবে, ফলে প্রতিক্রিয়া বল ও কম উৎপন্ন হবে। কাজেই আমরা এবারও কম ওজন অনুভব করব। অর্থাৎ আপনি যদি এমন একটি জায়গায় যেতে পারেন যেখানের মধ্যাকর্ষন বল পৃথিবীর তুলনায় অর্ধেক, তাহলে ঐ জায়গায় আপনি পৃথিবীর তুলনায় অর্ধেক ওজন অনুভব করবেন। এভাবে আপনি যদি এমন একটা জায়গায় যেতে পারেন যেখানে মধ্যাকর্ষন বল একেবারেই নাই, অর্থাৎ শুন্য, তাহলে ওখানে আপনার উপর কোনো প্রতিক্রিয়া বল কাজ করবে না, ফলে নিজেকে ওজনহীন অনুভব করবেন।
এ পর্যন্ত আমরা নিজেকে ওজনহীন অনুভব করার দুইটা শর্তের সাথে পরিচিত হলাম। একটি হলো প্রতিক্রিয়া বল সরিয়ে নেওয়া। আরেকটি হলো এমন এক জায়গায় চলে যাওয়া যেখানে মধ্যাকর্ষন বল নেই।
এখন দ্বিতীয় শর্তটি যাচাই করে দেখি। যে আসলে আমরা এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাই কি-না যেখানে মধ্যার্ষন বল নেই বা গ্র্যাভিটি শূন্য। যদি এরকম জায়গা খুঁজে পাই তাহলে অবশ্যই আমরা সেখানে ওজনহীন অনুভব করব।
তো শুরু করা যাক শূন্য গ্র্যাভিটি খোঁজার মিশন!! সরঞ্জাম হিসেবে একটি ক্যালকুলেটর নিয়ে বসুন।
আমরা সবাই জানি, স্যার আইজ্যাক নিউটনের মাধ্যমেই আমরা Gravity নামক বিষয়টির সাথে পরিচিতি লাভ করতে পেরেছি। তিনি আমাদের আশে পাশের সকল বস্তুর Gravitational Force ব্যাখ্যা করার জন্য অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি সূত্র আবিষ্কার করেন। যেটাকে আমরা মহাকর্ষ বলের সূত্র নামে জানি।
ধরা যাক আমরা A নামের একটা বস্তুর উপর পৃথিবীর মহাকর্ষ বল নির্ণয় করব, তখন নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রটিকে এভাবে লেখা যায়-
F = G(Mm)/d^2 -----(1)
যেখানে,
F = বস্তুদ্বয়ের মাঝে মহাকর্ষ বল
G = মহাকর্ষীয় ধ্রুবক
M = পৃথিবীর ভর
m = A বস্তুর ভর
d = পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে A বস্তুর কেন্দ্রের মধ্যে দূরত্ব।
এই সূত্র দিয়ে আমরা সুন্দর ভাবে আমাদের চার পাশের সকল বস্তুর মহাকর্ষ বল নিখুঁত ভাবে পরিমাপ করতে পারি। আবার এই সূত্রটিকে একটু মডিফাই করে আমরা কোন একটা বস্তুকে কোথা থেকে কিভাবে ছেড়ে দিলে সেটি কত ত্বরণে মধ্যাকর্ষন বলের দিকে পরবে সেটিও বের করতে পারি। সেটি বের করার জন্য নিউটনেরই আরেকটি সূত্রের সাহায্য নিতে হয়। নিউটনের বলের দ্বিতীয় সূত্র[কোনো বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার তার উপর প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক]। যেটাকে একটু Modify করে গাণিতিক সমীকরণ হিসেবে-
F = mg -----(2)
আকারে লিখা যায়।
এখন এই দুইটা সমীকরণ কে তুলনা করলে আমরা লিখতে পারি,
g = GM/d^2 ----(3)
এটিই হচ্ছে আমাদের কাঙ্খিত Gravity নির্ণয় করার সূত্র। এই সূত্রের মাধ্যমে আমরা আমাদের চারপাশের যেকোনো বস্তুর Gravity খুব সহজেই বের করে ফেলতে পারি। সূত্রটার দিকে একটু ভালো করে তাকালে দেখবেন এখানে বস্তুর অভিকর্ষজ ত্বরণটা কেবল মাত্র পৃথিবীর ভর আর পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে A বস্তুর কেন্দ্রের মধ্যকার দূরত্বের উপর নির্ভর করছে। আশ্চর্যজনক ভাবে A বস্তুর ভরটা উদাও হয়ে গেলো! হ্যাঁ এটাই সত্যি কোনো বস্তুর Gravity কোথায় কত হবে এটা বস্তুর ভরের উপর নির্ভর করে না, শুধুমাত্র দূরত্বের উপর নির্ভর করে। এটাই Practically প্রমান করে দেখিয়েছিলেন বিজ্ঞানী গ্যালিলিও!
তো আবার সূত্রে আসা যাক, সূত্রে d এর পরিচয় দেওয়ার সময় আমি বলছি এটি হচ্ছে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে বস্তুর কেন্দ্রের মধ্যকার দূরত্ব। তার মানেটা হলো বস্তুটা যদি ভূপৃষ্ঠ থেকে h মিটার উপরে থাকে, আর পৃথিবীর ব্যাসার্ধটাকে R ধরি তাহলে d = R + h হবে।
এতোক্ষণ তো সূত্র নিয়ে ঘাটাঘাটি করলাম, এবার কিছু অংক করা যাক। আপনিও এবার ক্যালকুলেটরটিকে কাজে লাগাবেন।
প্রশ্নঃ একটি বস্তু ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটার উচ্চতায় আছে। ঐ জায়গায় Gravity কত হবে?
উত্তর খুব সোজা! Just সূত্রে মান গুলো বসিয়ে দিলেই হবে।
জানা আছে,
মহাকর্ষীয় ধ্রুবক G = 6.673*10^-11 m^3 kg^-1 s^-2
পৃথিবীর ভর M = 5.97*10^24 kg
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ R = 6.37*10^6 m
আমরা জানি,
g = GM/d^2
g = GM/(R+h)^2
g = (6.673*10^-11)*(5.97*10^24)/(6.37*10^6+10)^2
= 9.81 m/s^-2
অর্থাৎ, হিসেব মতে ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটার উচ্চতা থেকে কোনো বস্তুকে ছেড়ে দিলে সেটি 9.81 m/s^2 সমত্বরণে নিচের দিকে পরতে থাকবে। কত্ত সহজে আমরা Gravity টা বের করে ফেললাম!!
এবার আমরা আরেকটু দূরে যাই, ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪০০ কি.মি. বা ৪০০০০০ মি. উচ্চতা থেকে যে Low Earth orbit এ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ঘুরতেছে তার কাছে যাওয়া যাক। অংক করে দেখি ওখানে Gravity কত!
আগের অংকটা যদি আমার সাথে সাথে আপনার ক্যালকুলেটরে মান বসিয়ে যাচাই করে থাকেন। তাহলে h এর মান ১০ এর পরিবর্তে ৪০০০০০ বসিয়ে দিন। দেখেন উত্তরটা কত আসে। যদি হিসেবে ভুল না হয় তাহলে প্রায় 8.69 m/s^-2 আসার কথা। এই মানটার দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে আরেকবার ভাবুন! আপনি কিন্তু মহাকাশ স্টেশনের Gravity বের করে ফেলছেন। আর এই মানটা কিন্তু মোটেও কম নয়।
এখন যদি আপনাকে কেউ প্রশ্ন করে যে পৃথিবী থেকে ৪০০ কি.মি. উপরে থাকা মহাকাশ স্টেশনের Gravity কত। আপনি কি Zero বলবেন?
অবশ্যই না, কারন আপনি গাণিতিক ভাবে প্রমাণ করেছেন সেখানে Gravity 8.9 m/s^-2 প্রায়।
এখন আপনি আপনার ক্যালকুলেটরের এই h এর মান টা ক্রমান্বয়ে বাড়াতে থাকেন। লক্ষ করবেন উচ্চতা যতোই বাড়াচ্ছেন। ততোই Gravity এর মান কমছে। তার মানে বুঝা গেলো ভূপৃষ্ঠ থেকে যত উপরের দিকে যাব তত Gravity এর মান কমতে থাকবে।
এবার একটা চেলেঞ্জে চলে যান, দেখেনতো Gravity এর মান টা কখনো শূন্য করতে পারেন কি না? আপনার ক্যালকুলেটরে যতোগুলো ডিজিট বসানো যায় সবগুলো ডিজিট বসিয়ে ট্রাই করেন। দেখবেন কখনো exact 0.0 আসবেনা। কিছু না কিছু অবশ্যই অবশিষ্ট থেকে যাবে।
তার মানে আপনি নিশ্চয় বলতে পারেন না যে লক্ষ লক্ষ কি.মি এর উপরে চলে গেলেও পৃথিবী আপনাকে টানবে না!!
অবশ্যই টানবে। উপরে উঠেও কক্ষপথ বরাবর গতিশীল না হয়ে স্থির থাকতে চান, কখনোই আপনি তা পারবেন না। পৃথিবীর Gravity আপনাকে সেখানে থাকতে দিবে না। এখন কথা হচ্ছে তাহলে মহাকাশ স্টেশন কিভাবে এতো মানের গ্র্যাভিটিকে উপেক্ষা করে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলছে?
হ্যাঁ, এখানে ব্যাপার হচ্ছে সে তার orbital velocity নিয়ে ঘুরছে। সে কখনোই ওখানে স্থির থাকতেছে না। স্থির থাকলে সে আর তার এই উচ্চতাটা ধরে রাখতে পারতো না। পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়তো। Gravity এর টান কে প্রতিহত করার জন্য তার gravity এর বিপরীত দিকে কেন্দ্রবিমুখী বলের প্রয়োজন হয়, আর এটাই সে তার orbital velocity বা কক্ষপথের বেগ থেকে পেয়ে থাকে।
তার মানে আমরা আমাদের এই মিশনে সফল হতে পারি নি। আমরা আমাদের পৃথিবীর আশে পাশে এমন কোন জায়গা পাই নি যেখানে মধ্যাকর্ষণ বল কাজ করে না।
এবার আমাদের দ্বিতীয় মিশন শুরু করা যাক। দেখি আমরা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া বল নিয়ে কিছু করতে পারি কি না..
এটি করার জন্য একটি এক্সপেরিমেন্ট করা যাক। যদি Thought Experiment করে বুঝতে পারেন তাহলে তো ভালোই, Otherwise "Do it at your own risk."
আপনি একটা ওজন মাপার যন্ত্র নিয়ে দোতলা বিল্ডিংয়ের ছাদে চলে যান। এবার যন্ত্রটির উপর দাঁড়িয়ে দেখুন আপনার সঠিক ওজন দেখাচ্ছে কি-না। ধরে নিলাম আপনার ওজন দেখাচ্ছে ৫৮৮ নিউটন।
আপনার ভর যদি ৬০ কেজি হয় তাহলে-
আমরা জানি,
ওজন = ভর * অভিকর্ষজ ত্বরণ
বা, ওজন = ৬০ * ৯.৮
বা, ওজন = ৫৮৮ নিউটন।
ওজন মাপা শেষ, এবার যন্ত্রটার উপর দাঁড়িয়ে যন্ত্রটাকে পায়ের সাথে বেধে নিন। তারপর বিল্ডিং এর ছাদ থেকে লাফ দিন(কল্পনায়)। এবার মাটি স্পর্শ করার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত যন্ত্রের রিডিং এর দিকে তাকিয়ে দেখুন। দেখবেন আপনার ওজন শূন্য দেখাচ্ছে!! আর আপনি নিজেকে ওজনহীন অনুভব করছেন!! এটাকেই বলা হয় Free fall বা মুক্ত পতন। অর্থাৎ আমরা যদি এমন ভাবে পরতে থাকি যাতে করে আমাদের উপর শুধুমাত্র মধ্যাকর্ষণ বল ছাড়া আর কোনো বল কাজ না করে তাহলে বলতে পারি আমাদের মুক্ত পতন হচ্ছে এবং আমরা তখন ওজনহীন অনুভব করি।
যদি Thought Experiment টি বুঝে থাকেন, আর নিজেকে মনে মনে ওজনহীন অনুভব করে থাকেন তাহলে Congratulations আপনার মিশন সফল। আপনি ওজনহীনতার শর্ত পেয়ে গেছেন। কিন্তু এই মুক্ত পতন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কি করে হচ্ছে সেটা বুঝার জন্য আরেকটি Thought Experiment করা যাক। যেট স্যার আইজ্যাক নিউটন নিজে করেছিলেন। আমরা তার মতো করেই ভেবে দেখি আসলে তিনি কি ভেবেছিলেন।
তিনি মূলত পৃথিবীর চারপাশে চাঁদের ঘুর্নন ব্যাখ্যা করার জন্য এই Thought Experiment টি করেছিলেন। পৃথিবীর মধ্যাকর্ষন বলের কারনে গাছ থেকে আপেল মাটিতে পরে গেলেও চাঁদ কেন পরে না সেটি বুঝার জন্যই তিনি এই এক্সপেরিমেন্টটি করেছিলেন, যা পরবর্তীতে তার Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica বইয়ে প্রকাশ করেছিলেন। এক্সপেরিমেন্টটা সহজ করে বললে অনেকটা এরকম ছিলো-
ধরুন আপনি একটি ক্রিকেট বল পৃথিবীর পৃষ্ঠ বরাবর সামনের দিকে ছুড়ে মারলেন। কি ঘটবে? বলটা পৃথিবীর মধ্যাকর্ষন বলের প্রভাবে কিছুদূর গিয়ে মাটিতে পরে যাবে। নিউটনের প্রথম সূত্রমতে, যদি পৃথিবীর এই মধ্যাকর্ষন বলটা না থাকতো তাহলে কিন্তু বলটা সরলরেখা বরাবর সামনের দিকে চলতেই থাকতো। এখানে যেহেতু বলটার উপর মধ্যাকর্ষন বল কাজ করছে, ফলে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে তার একটা ত্বরণ হয় আর সে নিচের দিকে পরতে থাকে। এবার যদি বলটাকে আরেকটু জোরে ছুড়ে মারেন তাহলে দেখবেন আরেকটু সামনে গিয়ে পরবে। এভাবে যতই জোরে ছুড়ে দিবেন ততই দূরে গিয়ে পরবে।
মানুষের পেশি শক্তি সীমিত। তাই এবার একটা শক্তিশালী মেশিনগান বা কামান নিয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে সেখান থেকে যেকোনো একদিকে ফায়ার করুন! মোটামুটি পাওয়ারে ফায়ার করলেও দেখা যাবে এটি অনেকটা পথ অতিক্রম করে মাটিতে পরে যাবে। আরও বেশি পাওয়ার দিয়ে ফায়ার করলে দেখা যাবে গুলিটি পৃথিবীর অর্ধেক দূরত্ব অতিক্রম করার পর মাটিতে পরে যাবে! আরও বেশি পাওয়ার দিয়ে ফায়ার করলে দেখা যাবে গুলিটি পৃথিবীর অর্ধেকের থেকেও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করার পর মাটিতে পরে যাবে। এবার ফুল পাওয়ার দিয়ে ফায়ার করলে বা নিউটনের তথ্যমতে যদি 8 km/s বেগে গুলিটি নিক্ষেপ করা হয় তাহলে দেখা যাবে গুলিটি আর মাটিতে পরছে না! বরং সম্পূর্ণ পৃথিবীকে পারি দিয়ে আবার মেশিনগানের পিছনে আঘাত করবে। এটাকে বলা হয় Orbital Velocity বা কক্ষপথের বেগ। পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে যত উপরের দিকে যাওয়া যাবে মধ্যাকর্ষন বল কমতে থাকায় এই কক্ষপথের বেগ তত কমতে থাকে
যদি ফায়ার করার পর মেশিনগানটি সরিয়ে নেওয়া হয় তাহলে দেখা যাবে গুলিটি পৃথিবীকে বৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করেই চলছে। আর মাটিতে পরছে না। মধ্যাকর্ষন বলের প্রভাবে সে ঠিকই পৃথিবীর পৃষ্ঠের সমান্তরালে বাকা পথ ধরে পরে যেতে চাইছে কিন্তু প্রতিক্ষেত্রেই সে পৃথিবীকে মিস করে যাচ্ছে। তখন বলা হবে গুলিটি একটি কক্ষপথে চলে গেছে। অর্থাৎ তার কক্ষপথ বরাবর মুক্ত পতন ঘটছে। আর এখানে তার উপর মধ্যাকর্ষন বলের জন্য উৎপন্ন কেন্দ্রমুখী বল এবং বৃত্তাকার পথে ঘুর্ণনের ফলে উৎপন্ন কেন্দ্রবিমুখী বল সমান হয়ে যায়। ফলে, না গুলিটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে পরতে পারছে, না পৃথিবী থেকে বাইরের দিকে চলে যেতে পরছে [নিচের ভিডিওটি দেখুন]। ঠিক এভাবেই চাঁদটাও আমাদের পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত প্রদক্ষিণ করে চলেছে। আর নিউটনের এই তথ্যকে কাজে লাগিয়েই আমরা পৃথিবীর চারপাশে বিভিন্ন কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপন করতে পারি। যারা একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌছানোর পর সেই কক্ষপথের বেগ নিয়ে অবিরত চলতে থাকে কোনোধরনের জ্বালানি ছাড়াই। শুধুমাত্র রকেট দিয়ে কক্ষপথের বেগটা অর্জন করিয়ে দিতে পরলেই হয়।
আর ঠিক একইভাবেই আমাদের আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনটিও Low Earth Orbit এ তার Orbital Velocity নিয়ে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। আর তখন তার এই বৃত্তাকার গতির জন্য উৎপন্ন কেন্দ্রবিমুখী বল এবং মধ্যাকর্ষন বলের প্রভাবে উৎপন্ন কেন্দ্রমুখী বল সমান হয়ে যায়। ফলে মহাকাশ স্টেশনের উপর মোট কার্যকর বল শূন্য হয়। আর এই কক্ষীয় গতির জন্য প্রতিনিয়ত মহাকাশযানটির কক্ষপথ বরাবর মুক্ত পতন ঘটছে। আর আমরা আমাদের Thought Experiment থেকে দেখেছি মুক্ত পতনের ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদেরকে ওজনহীন মনে হয়। আপনি যখন বিল্ডিং এর ছাদ থেকে লাফ দিচ্ছিলেন তখনও আপনার মুক্ত পতন হচ্ছিলো, আর আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনেরও মুক্ত পতন হচ্ছে। পার্থক্যটা শুধু দিকের। আপনি পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে মুক্তভাবে পরছিলেন, আর মহাকাশযান তার কক্ষীয় গতির জন্য কক্ষপথ বরাবর মুক্ত ভাবে পরছে। কাজেই আপনি যেমন ওজনহীন অনুভব করছিলেন ঠিক একইরকমভাবে মহাকাশচারীরাও নিজেদেরকে ওজনহীন অনুভব করে। মহাকাশযানের সাথে গতিশীল থাকা প্রত্যেকটি বস্তুর উপরই এভাবে মোট কার্যকর বল শূন্য হয়ে যায়। যার ধরুন মহাকাশযানের ভিতরে তারা যেমন ভেসে বেড়াতে পারে, ঠিক তেমনই যখন মহাকাশযান থেকে বের হয়ে তার বাইরের অংশের কোনো যন্ত্রাংশ মেরামত করার কাজ করে তখনও তারা ভেসে বেড়াতে পারে।


No comments:
Post a Comment