কীভাবে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বে প্রাণের খোঁজ করেন?
পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধান করার জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এর মধ্যে প্রধান কিছু পদ্ধতি হলো:
১. এক্সোপ্ল্যানেট অনুসন্ধান
এক্সোপ্ল্যানেট হলো এমন গ্রহ যা আমাদের সৌরজগতের বাইরে অবস্থিত এবং অন্য নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে বহু এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত করেছেন, যেগুলোর মধ্যে কিছু গ্রহকে "হ্যাবিটেবল জোনে" (বাসযোগ্য এলাকা) পাওয়া গেছে। এই হ্যাবিটেবল জোনে তাপমাত্রা এমন অবস্থায় থাকে যেখানে তরল পানি থাকতে পারে। যেমন, পৃথিবীর মতো পানির অস্তিত্ব থাকলে সেখানে প্রাণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
২. বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ
যেসব এক্সোপ্ল্যানেট বা গ্রহকে সম্ভাব্য বাসযোগ্য বলে ধরা হয়, সেগুলোর বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক উপাদান পরীক্ষা করা হয়। কিছু নির্দিষ্ট উপাদান যেমন অক্সিজেন, মিথেন, কার্বন ডাই অক্সাইড—এই সব গ্যাসগুলোর উপস্থিতি প্রাণের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিতে পারে। এই বিশ্লেষণ করতে মহাকাশ টেলিস্কোপ এবং বিশেষায়িত সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়।
৩. রেডিও সংকেত অনুসন্ধান
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বাইরের বুদ্ধিমান প্রাণের সন্ধানে রেডিও সংকেত খোঁজার কাজও করেন। এই কাজের অংশ হিসেবে SETI (Search for Extraterrestrial Intelligence) প্রকল্প চালু রয়েছে, যা মহাকাশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা রেডিও তরঙ্গগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখে কোনো বুদ্ধিমান সভ্যতা কোনো সংকেত পাঠাচ্ছে কি না।
৪. মঙ্গল ও অন্যান্য গ্রহে রোবটিক মিশন
আমাদের নিজস্ব সৌরজগতেও বিজ্ঞানীরা প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। যেমন, মঙ্গল গ্রহে পাঠানো বিভিন্ন রোবটিক মিশন (যেমন নাসার Perseverance Rover) সেখানে পুরনো জীবাশ্মের সন্ধান করছে, যা মঙ্গলে একসময় প্রাণের অস্তিত্ব থাকার প্রমাণ দিতে পারে। একইভাবে বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের উপগ্রহগুলোতেও গবেষণা করা হচ্ছে, কারণ সেখানে বরফের নিচে থাকা সমুদ্রগুলো প্রাণের অনুকূল পরিবেশ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কোন কোন গ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা রয়েছে?
১. মঙ্গল গ্রহ
মঙ্গলে প্রাণের সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। যদিও সেখানে এখন প্রাণের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে মঙ্গলের প্রাচীন নদী ও হ্রদের নিদর্শনগুলো থেকে মনে করা হচ্ছে, একসময় সেখানে তরল পানি প্রবাহিত হতো। পানি থাকার অর্থ, সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকাও সম্ভব।
২. ইউরোপা (Jupiter’s Moon)
বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা সম্ভবত আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় স্থানগুলোর একটি। এর বরফের নীচে বিশাল তরল পানির সমুদ্র থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যদি সেখানে কোনো ভূ-তাপীয় বা রাসায়নিক শক্তির উৎস থাকে, তাহলে সেই সমুদ্রে প্রাণের সম্ভাবনা থাকতে পারে।
৩. এনসেলাডাস (Saturn’s Moon)
শনি গ্রহের উপগ্রহ এনসেলাডাসও বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। উপগ্রহটির বরফের নীচে তরল পানির সমুদ্র রয়েছে, এবং সেখান থেকে গ্যাস ও জলীয় বাষ্প নির্গত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এই বাষ্পের রাসায়নিক উপাদান পরীক্ষা করে দেখেছেন, যা প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি নির্দেশ করে।
৪. প্রক্সিমা সেন্টোরি বি
পৃথিবী থেকে সবচেয়ে কাছের এক্সোপ্ল্যানেটগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রক্সিমা সেন্টোরি বি। এটি একটি ছোট্ট নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে এবং বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করে, যার অর্থ হলো সেখানে পানি তরল অবস্থায় থাকতে পারে। এই গ্রহটি প্রায় ৪.২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত, যা মহাকাশ ভ্রমণকারীদের জন্য সম্ভবত প্রথম টার্গেট হতে পারে।
৫. TRAPPIST-1 গ্রহমণ্ডল
TRAPPIST-1 নামক একটি নক্ষত্রের চারপাশে সাতটি পৃথিবীর মতো গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হ্যাবিটেবল জোনে রয়েছে। এই গ্রহগুলোতে তরল পানির সম্ভাবনা রয়েছে এবং তাদের বায়ুমণ্ডলও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে প্রাণের অনুসন্ধানে।
উপসংহার
মহাবিশ্বে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা আজকের বিজ্ঞানের অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়। এক্সোপ্ল্যানেট অনুসন্ধান, বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ, রেডিও সংকেতের সন্ধান এবং রোবটিক মিশনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে পৃথিবীর বাইরের প্রাণের সন্ধানে কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে, তা হবে মানব সভ্যতার জন্য এক বিশাল যুগান্তকারী আবিষ্কার। এখনকার বিজ্ঞানীদের সব প্রচেষ্টা সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
No comments:
Post a Comment