সূর্যগ্রহণ প্রকৃতির এক অনন্য, অনবদ্য ও খুবই স্বাভাবিক একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। আমরা হয়তো অনেকেই ইতিপূর্বে সূর্যগ্রহণ দেখেছি এবং বেচে থাকলে ভবিষ্যতে আরও দেখবো। সূর্যগ্রহণ বলুন আর চন্দ্রগ্রহণই বলুন, আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি এই গ্রহণের সময় নাকি এটা করতে নেই ওটা করতে নেই। খাবার খেতে নেই, বাইরে বের হতে নেই এরকম আরও কতো কিছু! তো, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, কেন গ্রহণের সময় খাবার খাওয়া বারণ? কেনই বা এতো নিষেধাজ্ঞা?
অনেকে মনে করে থাকেন, যেহেতু ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র অনুজীব গুলো সূর্যের আলোর প্রভাবে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে, তাই দিনের বেলায় তাদের প্রভাব অনেক বেশি থাকে। কিন্তু তখন দিনের বেলায় সূর্যগ্রহনের সময় চাঁদের ছায়ায় সূর্যের আলো কিছুটা ঢাকা পরে বলে পৃথিবী পৃষ্ঠে খানিক সময়ের জন্য কিছুটা অন্ধকার অবস্থার তৈরি হয়। ফলে ব্যাকটেরিয়ার মৃত্যু হারও বেড়ে যায় অনেক বেশি এবং তা আমাদের খোলা খাবারের উপর পরে। ফলে সেই খাবার যদি আমরা গ্রহণ করি তবে তা আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকারক হয়।
কিন্তু এখন ভেবে দেখুন তো- যদি তাই হয়, তাহলে প্রতি রাত্রেই তো অন্ধকার থাকার সময় খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যাকটেরিয়ার মৃত্যুহার বেড়ে যায়! তবে কি প্রতি রাতেই আমাদের খাবার না খেয়ে থাকতে হবে?? না, বিষয়টি ঠিক তা নয়। এই প্রথার বৈজ্ঞানিক কারণ জানতে হলে আমাদেরকে আজ থেকে অনেকটা পিছিয়ে যেতে হবে। পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় চার হাজার বছর আগে।
খৃষ্টপূর্ব ১৭০০ অব্দে ভারতে সৃষ্টি হওয়া পৃথিবীর প্রথম শাস্র ঋগ্বেদে এই প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও সেখানে পৌরাণিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমগ্র ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, রাহু এবং কেথোর প্রভাবের কথা। সেটাকে পরবর্তীকালে ৪৯৯ খৃষ্টাব্দে গণিতবিদ আর্যভট্ট লোনার নোডস নামে অভিহিত করেন। আপনারা আমার পূর্ববর্তী আর্টিকেল [প্রত্যেক মাসে কেন চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ হয় না?] থেকে জানতে পেরেছেন, এই লোনার নোডস গুলো পৃথিবী ও সূর্যের সাথে একই সরলরেখায় থাকলেই কেবল সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ হয়। এবং সূর্যগ্রহণের সময় পৃথিবীর একই পাশে চাঁদ এবং সূর্য অবস্থান করে। ফলে পৃথিবী চাঁদ আর সূর্যের ম্যাগনেটিক ফিল্ড মিলিত হয়ে এটি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। যার প্রভাব আমাদের সমুদ্রের জলরাশির মাঝেও দেখা যায়, যার ফলে তখন সমুদ্রে ভরা কটাল বা উচ্চ জোয়ার হয়!!
এই প্রভাব শুধুমাত্র সমুদ্রেই নয়, আমাদের মানব শরীরেও পরে। এই মিলিত ম্যাগনেটিক ফোর্স আমাদের শরীরের বায়ু ম্যাগনেটিজমকেও বাড়িয়ে দেয়! ফলে এসময় আমাদের ব্রেইন অন্যসবকিছু থেকে ফোকাস সরিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে থাক। এজন্য সূর্যগ্রহনের সময় অনেকের ক্ষেত্রে আচরণগত কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। খানিকটা অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। এটা কিন্তু কখনোই অস্বাভাবিকতার লক্ষন নয়। বরং এসময় এরকম আচরণ করাটাই স্বাভাবিক।
এই সময়ে মেডিটেশন করলে খুব সহজেই বিটা, থিটা এবং ডেল্টা ফ্রিকোয়েন্সির লেভেল অর্জন করা সম্ভব হয়। এজন্য প্রাচীন কালে সবাই বেশিরভাগ সময় এই সময়টাতেই মেডিটেশন করতো। আর মূলত মেডিটেশন খালি পেটেই বেশি ইফেক্টিভ হয়। এজন্য সূর্যগ্রহনের সময় যাতে পেটে পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা খালি থাকে তাই সূর্যগ্রহনের আগে থেকেই খাবার খাওয়া বারণ করা হতো।
আর সে সময়ের মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক ভাবনার পরিবর্তে কুসংস্কারে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন তাই তাদেরকে এই ঘটনার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য বিভিন্ন কাল্পনিক গল্পের আশ্রয় নিতেই হতো! আর এটাই হলো সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। সূর্যগ্রহনের সময় খাওয়া বা না খাওয়াতে ব্যাকটেরিয়ার কোনো প্রভাব থাকতে পারে না। আর সেই সময় বাহিরে বের হলে কারোর কোনো ক্ষতিও হয় না। কাজেই আপনারা সবাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের এই সূর্যগ্রহণকে উপভোগ করতে পারেন। তবে আবারও বলছি খালি চোখে নয়! চোখের উপযুক্ত সুরক্ষা নিয়ে তারপরই দেখবেন।
সূর্যের আলোকমন্ডল থেকে যে তীব্র দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য রেডিয়েশন নির্গত হয়, তা যদি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্যও সরাসরি আমাদের চোখে এসে পরে তবে তা চোখের রেটিনা স্থায়ীভাবে নষ্টের কারণ হতে পারে। এইভাবে চোখের ক্ষতির ফলে দৃষ্টি ক্ষুণ্ণ হতে পারে এবং অন্ধত্ব পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত হতে পারে৷ মূলত শুধু সূর্যগ্রহণের দিনই যে সূর্যের দিকে খালি চোখে তাকানো উচিত নয় - এমনটা নয়। যে কোনো সাধারণ দিনেও আমরা সূর্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকালে চোখের ক্ষতি হবে। সাধারণ পরিস্থিতিতে, সূর্য এতটাই উজ্জ্বল থাকে যে সরাসরি তার দিকে তাকানোই কঠিন। কিন্তু, গ্রহণের সময় সূর্যের অনেক অংশ আবৃত থাকায় তাকাতে আরও সহজ এবং লোভনীয় হয়। ফলে অনেকটা কৌতুহলবশতই আমরা সূর্যের দিকে খালি চোখে দৃষ্টিপাত করি, যেটা করা একদমই উচিত নয়। তাই এসময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়।

ধন্যবাদ।
ReplyDelete