![]() |
| চিত্র-১ঃ রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ!! |
রাতের পৃথিবীর আকাশে চাঁদই হলো সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু (Brightest Object)! তার উজ্জ্বলতা এতোটাই বেশি যে, পূর্ণিমার রাতে চাঁদের উজ্জ্বলতার জন্য তার আশেপাশের অন্যান্য তারাগুলোর আলো পর্যন্ত দেখা যায় না। সূর্যের আলো প্রতিফলন করে নিজেকে আলোকিত করার পরও তার এতো উজ্জ্বলতার প্রধান কারণ হলো, অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুগুলোর তুলনায় পৃথিবীর জন্য চাঁদই হলো সবচেয়ে কাছের মহাজাগতিক বস্তু (Celestial Body!) রাতের আকাশের এই উজ্জ্বল বস্তুটি নিয়ে আমাদের কতোই না কৌতুহল, কতোই না উপমা।
আমাদের পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ এই চাঁদের জন্য আমরা পৃথিবী থেকে বিভিন্ন রকমের মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে থাকি। তার মাঝে চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, অমাবস্যা, পূর্ণিমা, জোয়ার-ভাটা অন্যতম। আজকে তাই -
- চন্দ্রগ্রহণ, সূর্য গ্রহণ, অমাবস্যা, পূর্ণিমা কি কখন ও কীভাবে হয়?!
- প্রত্যেক মাসে কেন চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ হয় না?!
এই বিষয় গুলো নিয়ে আলোচনা করব।
চন্দ্রগ্রহণঃ
আমরা সবাই জানি, চাঁদ যেমন পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে তেমনি পৃথিবীও সূর্যকে কেন্দ্র করে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরছে। আমরা যদি চাঁদের উত্তর মেরুর উপর থেকে তাকাই, তাহলে দেখবো চাঁদ তার নিজ অক্ষের স্বাপেক্ষে ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে ঘুরছে, আবার একই সাথে সে পৃথিবীকে কেন্দ্র করেও ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে ঘুরছে। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে একটা সময় চাঁদ-সূর্য-পৃথিবী একই সরলরেখায় চলে আসে। যখন এই সরলরেখায় পৃথিবীটা, চাঁদ ও সূর্যের মাঝে চলে আসে, তখন পৃথিবীর ছায়ার জন্য চাঁদে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না, ফলে রাতের আকাশে চাঁদকে তখন কিছু সময়ের জন্য পৃথিবী থেকে দেখা যায় না। অর্থাৎ পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে আমাদের কাছে চাঁদ আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে কিছু সময়ের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ঘটনাটিকেই বলা হয় চন্দ্রগ্রহণ।
চাঁদ যখন পৃথিবীর চারপাশে পরিভ্রমণরত অবস্থায় কিছু সময়ের জন্য পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে, তখন কিছু সময়ের জন্য পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে আমাদের কাছে সূর্য আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ঘটনাকে বলা হয় সূর্যগ্রহণ।
মুলত এই কথাগুলো দ্বারা কেবল চন্দ্রগ্রহণ আর সূর্যগ্রহণকে সঙ্গায়িতই করা যায়, ঠিক ভাবে বিষয়গুলো উপলদ্ধি করা যায় না। বিষয়গুলো সঠিকভাবে অনুভব করতে নিচের চিত্রগুলোর সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে পড়ুন।
আমরা জানি, পৃথিবীর চারপাশে চাঁদের কক্ষপথ কিছুটা উপবৃত্তাকার হওয়ায় চাঁদ তার যাত্রাপথে যখন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে তখন তার দূরত্ব হয় প্রায় 363,396 km আর চাঁদের এই অবস্থানকে বলা হয় Perigee (Closer to Earth) আবার চাঁদ তার যাত্রাপথে যখন পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে চলে যায় তখন তার দূরত্ব হয় প্রায় 405,504 km. আর চাঁদের এই অবস্থানকে বলা হয় Apogee (Farther to Earth). ফলে পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব দাঁড়ায় 384,450 km.
![]() |
| চিত্র-২ঃ পৃথিবীর চারপাশে চাঁদের উপবৃত্তাকার কক্ষপথ |
সাইডেরিয়াল মাসঃ
চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে সম্পূর্ণ একবার প্রদক্ষিণ করতে যেই সময় নেয় সেই সময়ে পৃথিবী তার নিজের অক্ষের স্বাপেক্ষে ২৭ টি সম্পূর্ণ ঘূর্ণন সম্পন্ন করে ফেলে। পৃথিবীর চারপাশে চাঁদ সম্পূর্ণ একবার প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ২৭ দিন ৭ ঘন্টা ৪৩ মিনিট সময় নেয়। এটাকে বলা হয় Sidereal month.
যদি আমরা এমন একটা অবস্থান থেকে গণনা শুরু করি যখন পৃথিবী সূর্য এবং চাঁদ একই সরলরেখা বরাবর থাকে তবে যখন চাঁদ সম্পূর্ণ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করে তার আগের শুরুর অবস্থানে পৌছুবে তখন 1 Lunar phase complete হবে। যদি পৃথিবী তার কক্ষপথে স্থির থাকতো তবে এই 1 Sidereal Month আর 1 Lunar phase সমান হয়ে যেত!
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সাথে সাথে পৃথিবীও সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। ফলে সম্পূর্ণ Lunar Phase কে সম্পন্ন করার জন্য অর্থাৎ পৃথিবী ও সূর্যের সাথে একই সরলরেখায় আসার জন্য চাঁদকে ৩৬০° থেকে কিছুটা বেশি পথ অতিক্রম করতে হয়। ফলে বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় সম্পুর্ন একটা Lunar phase complete হতে Sidereal Month এর তুলনায় কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগছে। একটা সম্পুর্ন Lunar phase complete হতে প্রায় ২৯ দিন ১২ ঘন্টা ৪৪ মিনিট সময় লাগে, আর এটাকেই বলা হয় Synodic Month.
এখন আপনাদের মনে আমার মতো একটা প্রশ্ন আসতেই পারে- এই প্রতিটা Synodic Month Complete করার সময় চাঁদ অন্তত একবার করে পৃথিবী এবং সূর্যের মাঝখানে চলে আসে। তাহলে-
প্রত্যেক মাসে কেন সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ দেখা যায় না?
আসলে পৃথিবীর উপবৃত্তাকার কক্ষতল এবং চাঁদের উপবৃত্তাকার কক্ষতলের মাঝে সামান্য কৌণিক বিচ্যুতি রয়েছে। চাঁদের কক্ষতল আমাদের পৃথিবীর কক্ষতলের স্বাপেক্ষে ৫.১৪৫° কোণে আনত অবস্থায় রয়েছে।
এবার নিচের ছবির দিকে লক্ষ করুন। আপনারা এখানে যেই দুইটি হলুদ চিহ্নিত বিন্দু দেখতে পাচ্ছেন এগুলো হলো Lunar Nodes!![]() |
| চিত্র-৪ঃ Lunar Nodes |
এই Lunar nodes হলো এমন দুটি বিন্দু, যে দুটি বিন্দু দ্বারা উৎপন্ন সরল রেখায় Lunar orbital plane বা চাঁদের কক্ষতল এবং পৃথিবীর Ecliptic plane বা পৃথিবীর কক্ষতল একই সাথে মিলে যায়। অর্থাৎ এই দুই বিন্দুর সংযোজক সরলরেখায় পৃথিবীর কক্ষতল এবং চাঁদের কক্ষতল পরস্পর পরস্পরকে ছেদ করেছে। অর্থাৎ চাঁদ কেবলমাত্র এই Lunar nodes point দুটিতে থাকাকালীন অবস্থাতেই পৃথিবী ও সূর্যের সাথে একই তল শেয়ার করে। দেখা গেছে এই Lunar nodes গুলো প্রায় ১৭৩ দিন(প্রায় ৬ মাস) পর পর সূর্য এবং পৃথিবীর সাথে একই সরলরেখায় আসে। আর সেই সময় চাঁদ এই Lunar nodes এ অবস্থান করলেই কেবল চন্দ্রগ্রহণ এবং সূর্য গ্রহণ ঘটবে। চাঁদ যদি দিনের বেলায় পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে থেকে Lunar nodes এ অবস্থান করে একই সরলরেখায় চলে আসে তখন সূর্যগ্রহণ আর চাঁদ যদি রাতের বেলায় Lunar nodes এ (পৃথিবীর যে পাশে সূর্য তার বিপরীত পাশে) অবস্থান করে চাঁদ পৃথিবী সূর্য একই সরলরেখা বরাবর অবস্থান করে তখন চন্দ্রগ্রহণ হবে। একারণেই মূলত আমরা প্রত্যেক মাসে সূর্য এবং চন্দ্রগ্রহণ দেখি না!
![]() |
| চিত্র-৫ঃ Lunar Nodes পৃথিবী ও সূর্যের সাথে একই সরলরেখায়। |
সহজভাবে বললে চন্দ্রগ্রহণ মানে পৃথিবীর ছায়া দিয়ে চাঁদ ঢেকে যাওয়া, আর সূর্য গ্রহণ মানে চাঁদ দিয়ে সূর্যের আলো পৃথিবীতে পরতে বাধা দেওয়া।
চাঁদ যখন Perigee অবস্থানে থাকে অর্থাৎ পৃথিবী থেকে সবচেয়ে কাছে থাকে তখন চাঁদকে অন্যসময়ের তুলনায় বড় দেখায় যার ফলে তখন পৃথিবীর পৃষ্ঠের নির্দিষ্ট একটি বিন্দু থেকে দেখলে পুরো সূর্যটাকেই ঢেকে ফেলে এমন মনে হয়। আর এটাকেই বলা হয় Total solar eclipse.
আবার চাঁদ যখন একই সাথে Lunar nodes এবং Apogee অবস্থানে থাকে বা পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করে তখন চাঁদ পৃথিবীর নির্দিষ্ট কোনো একটি পয়েন্ট থেকে তাকালে দেখা যাবে তা কখনো সম্পূর্ণ সূর্যকে আড়াল করতে পারছে না। বরং সূর্যকে তখন একটি রিং এর মতো দেখায়। তখন এই অবস্থাটাকে বলা হয় Annular solar eclipse.
এছাড়া বাকি অবস্থান গুলোতে যখন Lunar nodes পৃথিবী ও সূর্যের সাথে exactly সরল রেখা বরাবর থাকে না, সামান্য পরিমান এদিক সেদিক হয়, তখন আংশিক চন্দ্রগ্রহণ এবং আংশিক সূর্যগ্রহণ হয়।
এ তো গেলো চন্দ্রগ্রহণ আর সূর্যগ্রহনের বিষয়। এখন আসা যাক অমাবস্যা ও পূর্ণিমার ক্ষেত্রে।
আপনি যদি উপরের টার্ম গুলো ভালো করে বুঝে থাকেন আর চাঁদের অবস্থানের স্বাপেক্ষে চাঁদের আকার পরিবর্তন হওয়ার ঘটনা টা জেনে থাকেন তাহলে খুব সহজেই এটা বুঝতে পারবেন।
আমরা জানি চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের সংযোজক সরলরেখার স্বাপেক্ষে সমকোণে থাকে তখন Half Moon বা অর্ধ চন্দ্র দেখি। চাঁদটা এখান থেকে ঘুরতে ঘুরতে যখন সূর্যের বিপরীত পাশে যেতে থাকে তখন তার আকৃতি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। এভাবে চলতে চলতে যখন একদম সূর্যের বিপরীত পাশে চলে যায় তখন সবচেয়ে বড় সম্পুর্ন চাঁদ বা Full Moon দেখি। এটাই হচ্ছে পূর্ণিমা। আপনারা এখন বুঝতেই পারছেন এক্ষেত্রে কিন্তু Lunar nodes গুলোকে অবশ্যই পৃথিবী ও সূর্যের সরলরেখা বরাবর থাকা যাবে না। Lunar nodes গুলো অন্যকোনো জায়গায় বা পৃথিবীর ও সূর্যের সরলরেখার স্বাপেক্ষে সমকোণে থাকার ফলে চাঁদ যখন সূর্যের বিপরীত পাশে চলে আসে তখন চাঁদটা পৃথিবীর কক্ষতল অপেক্ষা কিছুটা উপরে বা নিচে অবস্থান করে। ফলে চাঁদ সূর্যের বিপরীত পাশে থাকার ফলেও সূর্য থেকে আসা আলো পৃথিবীর উপর বা নিচ দিয়ে গিয়ে ঠিকই চাঁদকে আলোকিত করতে পারে। আর তা আমরা রাতের আকাশে পূর্নিমা হিসেবে দেখি। তখন পরিস্কার আকাশে তার দিকে তাকালে যেন চোখ ফেরাতেই মন চায় না।
![]() |
| চিত্র-৬ঃ পূর্ণিমার রৈখিক চিত্র। |
অমাবস্যাঃ
পূর্নিমার পরের দিনগুলোতে অর্থাৎ এবার চাঁদ যখন আবার ঘুরতে ঘুরতে অন্যপাশ দিয়ে সূর্যের দিকে যেতে থাকবে তখন পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান অনুযায়ী রাতের আকাশে চাঁদকে আবার ধীরে ধীরে ছোট হতে দেখব। এভাবে চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে তার কক্ষপথ বরাবর ঘুরতে ঘুরতে যখন পৃথিবীর যেই পাশে সূর্য সেই পাশে চলে যাবে তখন পৃথিবী থেকে রাতের আকাশে আর চাঁদ কে আর দেখা যাবে না। কারন রাতের আকাশে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন একদিকে আর চাঁদ ঘুরতে ঘুরতে চলে গেছে তার বিপরীত পাশে। আর এই অবস্থাটাকেই অমাবস্যার রাত বলা হয়।
![]() |
| চিত্র-৭ঃ অমাবস্যার রৈখিক চিত্র। |
এভাবে আবার পরের দিনগুলোতে যখন চাঁদ ঘুরতে ঘুরতে আবার সূর্য থেকে অপর পাশে যেতে থাকবে তখন চাঁদ উদিত হবে বা বাকা চাঁদ দেখা যাবে। কবি সাহিত্যকরা তাদের গল্প, কবিতায় এই বাকা চাঁদ আর পুর্নিমার চাঁদের সৌন্দর্যকে কতো ভাবেই না বর্ননা করেন!!








খুবই সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে প্রত্যেকটা বিষয়।আগে থেকে খুব একটা ধারনা না থাকলেও বিষয় গুলো বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না। এমন সহজ ভাষায় জ্যোতির্বিদ্যার অন্যান্য বিষয় গুলোও উপস্থাপন করা হলে পাঠকদের মাঝে জ্যোতির্বিদ্যার আগ্রহ বহু গুনে বেরে যাবে।
ReplyDelete